অধিকার আদায়ে সাংবাদিকদের সংগঠিত হতে হবে

প্রকাশিত: ৮:৪১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০২০

‘সাংবাদিকরা অসংখ্য গৌরবের অধিকারী। এটা রক্ষা করতে হলে সাংবাদিকদের সংগঠিত হতে হবে। আমাদের একটা প্রতিবাদে সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজবোর্ড তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটি আর সামনে বাড়েনি। এখন সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ হলে সাংবাদিকদের অধিকার আদায় বাস্তবায়িত হবে। সাংবাদিকদের মানমর্যাদা ধরে রাখতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগঠন গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই।’ বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে এক সৌজন্য স্বাক্ষাতে এসে একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও কলামিস্ট রণেশ মৈত্র এসব কথা বলেছেন।

সম্প্রতি কুড়িগ্রামে সাংবাদিককে নির্যাতনের ঘটনায় যথেষ্ট পরিমাণ প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হয়নি উল্লেখ করে দুঃখপ্রকাশ করে তিনি বলেন, এর বিরুদ্ধে আমাদের দেশে দুই-একটি লেখা দিয়ে কিছু হয়না। যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেস করতে হবে। তাদের গ্রেফতার করে জেলে পুরতে হবে। এটা বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য একটি বিশাল সুযোগ ছিলো খারাপ মানসিকতার অফিসারদের কাবু করার। এটা আরেকটি সুযোগ ছিল সাংবাদিকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করার। আর সেটি করতে পারলে প্রতিটি পত্রিকা অফিসে সাংবাদিকদের সম্মান বাড়তো।
তিনি আরো বলেন, আগে হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা ছিল। কিন্তু এখন বিশাল বিশাল পত্রিকার সংখ্যা ঢের। তাই সাংবাদিকদের সংখ্যাও বেশি। বাংলাদেশ হয়েছে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পীদের অবদানও কম ছিলনা। সাংবাদিকদের রিপোর্টিংয়ে এ বিশ্ব আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। জাতিসংঘ আমাদের সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। না হলে ওই লড়াইতে বিজয়ী হওয়া খুব কঠিন ছিল। আপনি আমি তার উত্তরসূরী। তাহলে সাংবাদিকদের মর্যাদাটা কেমন থাকা উচিৎ ছিল। আজ সাংবাদিকদের সংগঠন শক্তিশালী নাই বলে, একতা নেই বলে; সারাদেশে সাংবাদিকদের মর্যাদাটা ঠিকঠাকভাবে পাচ্ছেনা।

রমেশ মৈত্র বলেন, সংবাদপত্র জগতে ডেস্কে যারা কাজ করেন তারা রিপোর্টারদের বাঁকা চোখে দেখেন। পুরোপুরি বাঁকা চোখে দেখেন। আমি যখন একুশে পদকপ্রাপ্ত হলাম তখন যাদের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছি সেসব জায়গা থেকে খুব কম অভিনন্দন বার্তা পেয়েছি। দুই নম্বর সাংবাদিক মনে করা এমন স্বভাব দূর করা যাবে যদি আপনিও একজন স্টাফ হতে পারেন। আপনি পেইড জার্নালিস্ট যদি হন। সাংবাদিকতা করে অনেকের গাড়ি-বাড়ি হয়েছে কিন্তু নীতিনিষ্ঠ যারা, মফস্বলের যারা, তাদের সেসব হয়নি।

মফস্বল সাংবাদিকতা নিয়ে রমেশ মৈত্র বলেন, মফস্বলে অনেকে দাপটের সাংবাদিকতা করে। এদের মানুষ ভয় করে। তাদের বলবো, কারো ব্যক্তিগত লোক না হয়ে মানুষের লোক হন। কোন মন্ত্রীর, কোন এমপি’র, কোন ব্যবসায়ীর, কোন দলের লোক হবেন না সাংবাদিক। পাপিয়া, সম্রাটকে দেখে যদি সাংবাদিক ঘৃণা না করে চুপ করে থাকে তবে দেশের জনগণের কাছে কি সাংবাদিকের মুখ থাকে? বিবেকের কাছেও থাকবেনা। এখনই সাংবাদিকদের একটি ঐক্যবদ্ধ সংগঠন গড়ে তোলা দরকার। লক্ষ্য হবে গোটা সাংবাদিক সমাজের একটা সংগঠন। জাতীয় ভিত্তিতে সাংবাদিকদের একটা সংগঠন গড়ে ওঠা দরকার।

সৌজন্য স্বাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি এড. মাহবুবুর রহমান মাসুম, খেলাঘর আসর জেলার সভাপতি রথীন চক্রবর্তী, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান বাদল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সাউদ মাসুদ, নাফিজ আশরাফ, শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের (এনইউজে) সাধারণ সম্পাদক আমির হোসাইন স্মিথ, সহসভাপতি ইমামুল হাসান স্বপন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি, সাংবাদিক নাহিদ আজাদ, মাকসুদুর রহমান কামাল, রফিকুল ইসলাম রফিক, আল আমিন খান মিঠু, প্রণব কৃষ্ণ রায় প্রমুখ। সৌজন্য স্বাক্ষাতে নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিকরা মফস্বল সাংবাদিকতার নানা প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন।

প্রসঙ্গত, রণেশ মৈত্র বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক, কলামিস্ট, ও রাজনীতিবিদ। মৈত্র ১৯৩৩ সালের ৪ অক্টোবর রাজশাহী জেলায় তার নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রমেশ মৈত্র ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি ১৯৫০ সালে জিসিআই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। পরে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ১৯৫৫ সালে আইএ এবং ১৯৫৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। মৈত্র ১৯৫১ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকায় সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সত্যযুগে তিন বছর সাংবাদিকতা করার পর ১৯৫৫ সালে দৈনিক সংবাদে যোগ দেন। তিনি ১৯৬১ সালে ডেইলি মর্নিং নিউজ এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দৈনিক অবজারভারে পাবনা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে দি নিউ নেশনের মফস্বল সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি দি ডেইলি স্টারের পাবনা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে দেশের শীর্ষ পত্রপত্রিকায় কলাম লিখেছেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন।

একজন বর্ষিয়ান রাজনীতিক ও আইন পেশার পাশাপাশি জীবনের প্রায় প্রতিটি মূহুর্তেই সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাকে আঁকড়ে ধরে থাকা সাংবাদিক ও কলামিষ্ট রণেশ মৈত্রকে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।